📚 রামরাম বসু — জীবনকাহিনি ও MCQ
রামরাম বসু
বাংলা গদ্যের আদি লেখকদের অন্যতম • মুন্সি • লেখক • অনুবাদক
১. রামরাম বসুর পরিচয়
রামরাম বসু ছিলেন অষ্টাদশ শতকের একজন গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি লেখক ও মুন্সি। বাংলাপিডিয়া তাঁকে বাংলা গদ্যের প্রথম দিকের অন্যতম লেখক হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সবচেয়ে বড় অবদান বাংলা গদ্যের বিকাশে। তাঁর রচনার মাধ্যমে বাংলা ভাষায় প্রাথমিক আধুনিক গদ্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা তৈরি হয়।
২. জন্ম ও শৈশব
রামরাম বসুর জন্ম আনুমানিক ১৭৫৭ সালে হুগলির চুঁচুড়ায়। তাঁর জীবনের প্রথম দিক সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না।
জীবিকার প্রয়োজনেই তিনি ফারসি ভাষা শেখেন। পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কথ্য ইংরেজিও শেখেন।
৩. মুন্সি হিসেবে কর্মজীবন
রামরাম বসু বিভিন্ন ইংরেজের মুন্সি হিসেবে কাজ করেছিলেন। উইলিয়ম চেম্বার্সের সুপারিশে ব্যাপটিস্ট ধর্মপ্রচারক জন টমাস তাঁকে ১৭৮৭ সালের ৮ মার্চ বাংলা মুন্সি হিসেবে নিয়োগ করেন।
জন টমাসের সঙ্গে কাজ করার সময় তিনি বাংলা ভাষা শেখানোর কাজ করেন। এর মাধ্যমে ইউরোপীয় মিশনারিদের বাংলা শেখার প্রক্রিয়ায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তৈরি হয়।
৪. উইলিয়ম কেরীর সঙ্গে সম্পর্ক
১৭৯৩ সালে জন টমাসের মাধ্যমে উইলিয়ম কেরীর সঙ্গে রামরাম বসুর পরিচয় হয়। কেরী তাঁকে বাংলা শেখানোর জন্য মুন্সি হিসেবে নিযুক্ত করেন।
রামরাম বসুর কাছ থেকে কেরী বাংলা শেখেন এবং বাংলা বাইবেল অনুবাদের কাজেও তাঁর সহায়তা নেন। তাঁদের সম্পর্ক সবসময় একই রকম ছিল না; কর্মজীবনে মতবিরোধও দেখা দিয়েছিল।
৫. শ্রীরামপুর মিশনে কাজ
১৮০০ সালে উইলিয়ম কেরী, উইলিয়ম ওয়ার্ড এবং যশুয়া মার্শম্যানের উদ্যোগে শ্রীরামপুর মিশন ও প্রেস গড়ে ওঠে। এই সময় রামরাম বসু আবার কেরীর অধীনে কাজ শুরু করেন।
এবার তাঁর কাজের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম বিষয়ক সাহিত্য রচনা ও অনুবাদ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই সময় তিনি গদ্য ও পদ্য— দুই ধরনের লেখালেখিতেই অংশ নেন।
৬. ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে যোগদান
১৮০১ সালের মে মাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে কেরীর অধীনে বাংলা বিভাগ শুরু হলে রামরাম বসু সেখানে সহকারী মুন্সি হিসেবে নিযুক্ত হন।
কলেজে তাঁর প্রধান কাজ ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় সহায়তা করা। ছাত্রদের জন্য উপযোগী বাংলা পাঠ্যবই রচনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
৭. রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে যোগদানের অল্প সময়ের মধ্যেই রামরাম বসু ছাত্রদের জন্য রচনা করেন ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’। গ্রন্থটি ১৮০১ সালের জুলাই মাসে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়।
বাংলাপিডিয়া এটিকে বাংলা গদ্যের প্রথম দিকের মৌলিক গ্রন্থগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করে। এই গ্রন্থের জন্য তিনি কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পুরস্কারও পান।
৮. লিপিমালা
১৮০২ সালে রামরাম বসু প্রকাশ করেন ‘লিপিমালা’। এটি বিভিন্ন বিষয়ের চিঠিপত্রের একটি আদর্শ সংকলন হিসেবে তৈরি হয়েছিল।
বাংলা গদ্যের বিকাশে এই ধরনের ব্যবহারিক রচনা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাধারণ মানুষের লিখিত যোগাযোগের ভাষাকে বইয়ের মাধ্যমে উপস্থাপনের একটি প্রাথমিক উদাহরণ হিসেবে এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
৯. ভাষা ও লেখার বৈশিষ্ট্য
রামরাম বসুর সমসাময়িক ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অনেক বাংলা লেখক সংস্কৃতনির্ভর ভাষাশৈলী ব্যবহার করতেন। রামরাম বসুর গদ্যে ফারসি ভাষার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
তাঁর লেখায় সে সময়কার প্রচলিত বাংলা গদ্যের একটি ঐতিহাসিক চিত্র পাওয়া যায়। এই কারণেই বাংলা গদ্যের ইতিহাসে তাঁর রচনা বিশেষ মূল্যবান।
১০. মৃত্যু ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকার
রামরাম বসু ৭ আগস্ট ১৮১৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বাংলা গদ্যের প্রাথমিক বিকাশে তাঁর অবদান তাঁকে বাংলা সাহিত্য-ইতিহাসে একটি স্থায়ী স্থান দিয়েছে। তাঁর ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ ও ‘লিপিমালা’ বাংলা গদ্যের বিকাশের ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত।